শিরোনামঃ

জুড়ীতে উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে হামলা-ভাঙচুর, দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখল জনতা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ এলাকায় তিনি খুবই প্রভাবশালী ও মদ্যপায়ী ব্যক্তি হিসেবে অধিক পরিচিত। দিন কিংবা রাতে মদ্যপান করা যার নেশা। প্রায়শই তাঁর বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য এলাকার লোকজন ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়। কেউ প্রতিবাদ করার কোন সাহস পায়না। এবার মহামারি করোনা ভাইরাসও তাঁর ওইসকল বিতর্কিত কর্মকান্ডকে ঠেকাতে পারেনি। সেই বিতর্কিত ব্যক্তি হলেন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ মোঈদ ফারুক। শুক্রবার রাতে উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের পশ্চিম আমতৈল গ্রামে তাঁর নেতৃত্বে একদল লোক একটি মোরগের খামারে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাঁদের ধাওয়া করেন। এ সময় উপজেলা চেয়ারম্যান মোঈদ ফারুককে একটি বাড়িতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সময় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে আনে। এম এ মোঈদ ফারুক আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গত উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করে বিজয়ী হয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের পশ্চিম আমতৈল গ্রামে ‘বন্ধু পোলট্রি ফার্ম’ নামের স্থানীয় বাসিন্দা দীনবন্ধু সেনের একটি মোরগের খামার রয়েছে। খামারটি নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের আস্তাভাজন সাইদুলের চাচা আব্দুল মতিনের সাথে দীনবন্ধু সেনের পূর্ব থেকে একটি বিরোধ চলে আসছিল। এক পক্ষ পরিবেশ দূষণের কারণ দেখিয়ে ওই খামারটি বন্ধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছে। অপর দিকে খামার মালিকদের সংগঠনসহ স্থানীয় আরেকটি পক্ষ খামারটি রক্ষার দাবি জানাচ্ছে। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে উপজেলা চেয়ারম্যান এম এ মোঈদ ফারুকের ২৫-৩০ জন সহযোগী (পেটুয়া বাহিনী) দেশীয় বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে ওই খামারে গিয়ে আকস্মিক হামলা-ভাঙচুর চালানো শুরু করেন। তাঁরা খামারের কিছু মোরগ ছেড়ে দেন এবং জবাই করেন। এ ছাড়া খামারের টিনের বেড়া, আসবাব ভাঙচুর করে মোরগ লুটপাট করেন। এ সময় বাঁধা দিলে উপজেলা চেয়ারম্যান মোঈদ ফারুক দীনন্ধুর বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেন।

একপর্যায়ে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শাহজাহান ভূঁইয়া গিয়ে বাধা দিলে তাঁকেও মারধর করা হয়। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এলাকার লোকজন হামলাকারীদের ধাওয়া করলে চেয়ারম্যান ও তাঁর সহযোগীরা দৌঁড়ানো শুরু করেন। চেয়ারম্যান স্থানীয় একটি বাড়িতে ঢুকে পড়লে সেখানে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে জুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন সরদারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিরাও সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। এ সময় ওসি হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে লোকজন ফিরে যান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান উপজেলা চেয়ারম্যানের ছোট ভাই এম এ মোনেম। তিনি ঘটনাটিকে তাঁদের ‘পরিবারের লজ্জা’ বলে উল্লেখ করেন।পরে পুলিশ পাহারায় চেয়ারম্যানকে উপজেলা সদরে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। আহত আওয়ামী লীগের নেতা শাহজাহানকে মৌলভীবাজারের ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

খামার মালিক দীনবন্ধু সেন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ২৬ শতক জায়গার ওপর এই খামারটি করতে ৪৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া জুড়ী কৃষি ব্যাংক থেকে ২০ লক্ষ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ৫ বছর থেকে ঋণটি চালু আছে। এই খামারটি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এরপরও উপজেলা চেয়ারম্যান রাতে আমার প্রতিপক্ষের ইন্ধনে উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে মাতাল হয়ে আমার বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে খামারে তান্ডবলীলা চালান।

শনিবার দুপুরে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি হামলা ও ভাঙচুরের কথা স্বীকার করে বলেন, তাঁর কোন ইচ্ছা ছিলনা এমন ঘটনা ঘটানোর। কাজটি করা তার ঠিক হয়নি, অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন। এদিকে অস্ত্র ও মদ্যপানের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁর সাথে কোন অস্ত্র ছিলনা, এটা ছিল সিগারেট টানার বেভার মেশিন। আর তিনি কখনো মদপান করেননি।

এ ব্যাপারে জুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার শনিবার মুঠোফোনে বলেন, আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না। সে যেই হোক না কেন। কেউ অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন শনিবার সকালে মুঠোফোনে বলেন, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান যদি অপরাধ করে থাকেন তাহলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিষয়টি তাঁরা দেখছেন।

অন্যান্য খবর পড়ুন