শিরোনামঃ

করোনাকালের কর্মী

রণজিৎ সরকারঃ করোনা ভাইরাসের কারণে অনেকের মনের ভেতর মৃত্যুভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। করোনার কাল দূর করার জন্য ঘরে বসে কেউ নাটক-সিনেমা দেখে, কেউ বই পড়ে, কেউ ফেসবুকিং করে, আবার কেউ কেউ মোবাইলে গেম খেলে সময় পার করছে। সুমনা বই পড়ে, লেখালেখি করে আর ফেসবুকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে প্রতিবাদী ও দিকনির্দেশনামূলক স্ট্যাস্টাস দেয়। কিন্তু সুমনার কাছের তিন বন্ধু রাইসা, রাশেদ ও সজল। ওদের বেশিরভাগ সময় কাটে মুভি দেখে আর বিশেষ করে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে লুডু খেলে। লুডু খেলাতে সুমনার ইচ্ছা না থাকলেও মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে খেলায় অংশগ্রহণ করতে হয়। গ্রুপে লুডু খেলতে খেলতে সুমনা আজ বলতে শুরু করল, ‘তোদের একটা কথা বলতে চাই। শুনবি।’
‘খেলার মাঝে কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবি।’ রাশেদ বলল।
‘বুঝেছি। তুই এবার হেরে যাবি। তাই অন্য প্রসঙ্গ।’ রাইসা মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বলল।
‘সুমনা নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে। শুনি না কথা।’ সজল গুরুত্ব দিয়ে বলল।
সুমনা আবার বলতে শুরু করল- ‘শোন, করোনাকালে কতজন কতভাবে গরিব ও দিনমজুরদের সাহায্য করছে। আমরা ফেসবুকে ও গণমাধ্যমের কারণে জানতে পারছি। বিশেষ করে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন কত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। শেরপুর জেলার ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন নিজের জমানো টাকা সরকারি ত্রাণ তহবিলে দান করে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই সংকটে তার চেয়ে আর দানবীর কে আছে। চিত্রনায়িকা জয়া আহসান নিজ হাতে বাসা থেকে রান্না করে পথের কুকুরদের মাংস-ভাত খাওয়াচ্ছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য তিলোত্তমা শিকদার বরিশালে রোজাদার কর্মহীন, ভাসমান, খেটেখাওয়া মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ইফতার বিতরণ করছেন। এছাড়াও আরো কতজন কতভাবে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের তো সামর্থ্য আছে। চলমান দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছি না কেন? বিবেকের কাছে অপরাধবোধ অনুভব করছি। আমরা কি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি না?’
‘অবশ্যই পারি। ভালো আইডিয়া বের করেছিস। শুধু ফেসবুকে প্রতিবাদী স্ট্যাস্টাস দিলেই চলবে না।’ রাইসা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।
‘আমরা তাহলে তো একটা ফান্ড গঠন করতে পারি। যে ফান্ডের লেনদেন হবে বিকাশের মাধ্যমে।’ রাশেদ বলল।
‘সুমনা, তুই কি চিন্তা করেছিস না। কোন শ্রেণির মানুষদের পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়াবি।’ সজল বলল।
‘গতকাল অনলাইনে একটা পত্রিকার রিপোর্ট পড়ে জানতে পারলাম ভাসমান ও যৌনপল্লিদের চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে যৌনপল্লির ভেতর বয়স্ক যৌনকর্মী বসবাস করে। তারা যৌনপল্লির বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে, এখন সব বন্ধ হয়ে গেছে তাই কোনো কাজকর্ম না থাকায় সবাই বেকার। অনেকে সহযোগিতা পেলেও তারা এখনো কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছেন না। একবেলায় খেয়ে না খেয়ে দিনরাত পার করছেন। তাদের সাহায্য করতে চাই।’
‘অবশ্যই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব।’ তিনজনের মানবিক মন জেগে উঠে একসাথে বলল।
‘তাহলে প্রথমে আমাদের একটা ফান্ড গঠন করতে হবে। এবং আমাদের পরিচিতি যারা আছে, তাদের কাছ আমাদের উদ্দেশের কথা বুঝিয়ে বলতে হবে। আশা করি কেউ খালি হাতে ফেরাবেন না। কথায় আছে না, দশের লাঠি একের বোঝা। আগামীকাল থেকেই ফান্ডে টাকা সংগ্রহের কাজ শুরু করতে হবে।’
সুমনার কথা শুনে সজল ভাবে- সত্যি তো লকডাউনে যৌনকর্মীদের আয়ের পথ বন্ধ। তাদের কাছে কোনো খদ্দের যেতে পারছে না।
‘তুই আসলেই বুদ্ধিমতী রে সুমনা। সে জন্য তোকে আমাদের বন্ধুমহলের সবাই পছন্দ করে। তুই ক্রিয়েটিভ মানুষ সে জন্য তোর মাথা থেকে এমন আইডিয়াটা বের হয়েছে।’ রাইসা বলল।
‘আমার হাবু বর বলে, সুমনা, তুমি শিক্ষক না নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা উপদেষ্টা হলে ভালো করতে।’ কথাগুলো বলে সুমনা নিজেই হেসে ফেলে।
‘ঠিক বলেছেন রণক দুলাভাই।’ সজল মুচকি হাসি দিয়ে বলল।
‘তোরা আর আমাকে লজ্জা দিস না।’
‘আমার একটা প্রশ্ন সুমনা। তুই কি বাংলাদেশের সব যৌনপল্লিতে সাহায্য করতে পারবি।’ রাশেদ বলল।
‘তা কি করে সম্ভব। তবে আমি ওই রিপোর্টের মাধ্যমে জানতে পারি, ভাসমান যৌনকর্মীর সংখ্যা অন্তত ১ লাখ হবে। আর এনজিও সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সেড) ২০১৭-১৮ সালে জরিপ করে বলেছিল, ১১টি যৌনপল্লিতে প্রায় ৪ হাজার মেয়ে কাজ করেন। সবাইকে কি আমরা সাহায্য করতে পারব। মনে হয় পারব না।’
‘সবাইকে আমাদের পক্ষে থেকে সাহায্য করা সম্ভব।’ সাহস ও মনোবল নিয়ে রাইসা বলল।
‘আমরা যদি চেষ্টা করি, তাহলে মনে হয় পারব। এটা আমার বিশ্বাস। কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছানো যাবে কি করে, সে নিয়ে চিন্তায় আছি।’
‘সুমনা, তুই কোনো চিন্তা করিস না। আমরা বড় ভাইয়ের বন্ধু সাংবাাদিক তার সাথে সারা দেশের সাংবাদিককের ভালো সম্পর্ক আছে। ভাইকে বলব, যে এলাকায় যৌনপল্লি আছে। সেই এলাকার সাংবাদিক ভাইয়ের মাধ্যমে সাহায্য পৌঁছে দেব।’ আত্মবিশ্বাস নিয়ে সজল বলল।
‘সত্যি তাই! গুড আইডিয়া। এখন ফান্ডে টাকা সংগ্রহের কাজে নেমে পড়ি সবাই।’
আজকের মতো লুডু খেলা শেষ করল ওরা।
পরদিন থেকে ওরা ফান্ড গঠন করে টাকা সংগ্রহ করা শুরু করল। দশ দিনে অনেক মানবতার মানবিক মনের মানুষের সাড়া পেল। ফান্ডে প্রায় চার লাখ টাকা জমা হলো। যৌনপল্লির এলাকার সাংবাদিকদের মাধ্যমে যৌনকর্মীদের বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করল। তারপর বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে তিন হাজার করে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া শুরু করল ওরা। ওই নিউজের সূত্রে ধরে ভাসমান পতিতাদের সংগঠনের নেত্রীকে খুঁজে বের করল। তার মাধ্যমে ভাসমান যৌনকর্মীদের সাহায্য পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করল লুডু গ্রুপের চার বন্ধু।
স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফেরার আশায় সবার মতো ওরাও দিন গুনছে।

অন্যান্য খবর পড়ুন