শিরোনামঃ

জুড়ীর লাঠিটিলায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি

সাইফুল ইসলাম সুমন, জুড়ীঃ অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের মৌলভীবাজার। এ এলাকার নয়নাভিরাম চা বাগান, পাহাড়-টিলার সবুজের বিশালতা, উদ্যান, ইকোপার্ক, হাওর, জলপ্রপাত, নদ নদী, খাল-বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যুগ যুগ ধরে ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করে আসছে। সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি হাওর বেষ্ঠিত জুড়ী উপজেলার লাঠিটিল্লা এলাকায় ৯৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রেখে জুড়ীতে আন্তর্জাতিকমানের এই সাফারি পার্ক গড়ে উঠলে চিত্ত বিনোদনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, সংরক্ষন করা যাবে জীববৈচিত্র্য।

দু‘টি পাতা একটি কুড়ির দেশ এবং ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ নিমাত্রা (রহঃ), হযরত শাহখাকী (রহঃ), হযরত শাহ্ কোয়াছিম উদ্দীন জীবন জ্যোতি (রহঃ) এর স্মৃতিবিজড়িত পূণ্যভূমি জুড়ী এলাকা। উপজেলা সদর হতে লাঠিটিল্লার দিকে রওনা হলেই চোখে পড়ে মসৃণ সবুজে ছাওয়া উঁচু-নিচু টিলা, সবুজ বনানী, বর্ণিল পাখি আর উপরে বিস্তৃত নীল আকাশ।

কক্সবাজারের ডুলাহাজারা ও গাজীপুরের পর জুড়ীর লাঠিটিল্লা এলাকায় হতে যাচ্ছে দেশের তৃতীয় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। ৫ হাজার ৬শ ৩১ একর বনভূমির ওপর নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন সম্প্রতি অনুমোদন করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

মৌলভীবাজার জেলা সদর হতে ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ৫০ কিলোমিটার উত্তরে এবং মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে জুড়ীর লাঠিটিলা এলাকায় নির্মিতব্য সাফারি পার্কের ৫ হাজার ৬৩১ একরের মধ্যে ইকো-ভিলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে ৮০০ একর জায়গায়, ৭০০ একরে জঙ্গল সাফারি, ৩০০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হবে কোর সাফারি। এই কোর সাফারি এলাকায় বাস বা জিপে চড়ে উম্মুক্ত, বাঘ, সিংহ, চিতা, ভালুক, হরিণ, জেব্রা, জিরাফ, হায়েনা, সরীসৃপ, গন্ডারসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রাণী ও প্রকৃতির কাছাকাছি যাবার সুযোগ পাবে পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।

২০৯ প্রজাতির প্রাণী এবং ৬০৩ ধরনের প্রজাতির উদ্ভিদ সম্পন্ন প্রস্তাবিত এলাকায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক স্থাপিত হলে এখানে আরও অধিক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণির সম্মিলন ঘটবে। সংরক্ষিত এই বনভূমি অবৈধ দখলের হাত থেকে মুক্ত থাকার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে।

সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্যান্য এলাকার চাইতে লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক স্থাপন অধিক সুবিধাজনক ও বাস্তবভিত্তিক। এখানে সাফারি পার্ক স্থাপিত হলে বনভূমি অবৈধ দখল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত পর্যটকগণ এ সাফারি পার্কে এসে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি প্রাণীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন এমপি বলেন, বর্তমানে সরকারি এ বনভূমির অভ্যন্তরে ৫৮টি পরিবার বসবাস করছে যাদেরকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। অবশিষ্ট পরিবারগুলোর সমন্বয়ে ইকোভিলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক স্থাপনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরো জানান, ২০৯ প্রজাতির প্রাণী এবং ৬০৩ ধরনের প্রজাতির উদ্ভিদ সম্পন্ন প্রস্তাবিত এলাকায় সাফারি পার্ক স্থাপিত হলে এখানে আরও অধিক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণির সম্মিলন ঘটানো হবে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত পর্যটক এ সাফারি পার্কে এসে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি প্রাণীর সাথে পরিচিত হতে পারবেন।

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাই করে লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক নির্মাণের উপযুক্ত বলে মনে হয়েছে। এখানে মূলত বনভূমি রক্ষা করে সাফারি পার্ক নির্মাণ করা হবে।

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির টিম লিডার ড. তপন কুমার দে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে লাঠিটিলায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে রিপোর্ট পেশ করেছি। এখানে সাফারি পার্ক নির্মাণ হলে বনভূমি দখলমুক্ত হবে এবং প্রাণীর সংখ্যা বাড়বে।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সাফারি পার্কের জন্য নির্ধারিত সমতল ভূমি দীর্ঘদিন থেকে রয়েছে ভিলেজারদের দখলে। তারা সেখানে ভোগ দখল করে চাষাবাদ করছে। লাঠিটিলা সংরক্ষিত বন অক্ষত রেখে সমতল ভূমিতেই হবে সাফারি পার্ক। সাফারি পার্ক হলে নিবিড় তদারকির মাধ্যমে সেখানকার জীববৈচিত্র্য অক্ষত থাকবে।

লাঠিটিলায় দেশের তৃতীয় সাফারি পার্ক নির্মাণের খবরে জেলাজুড়ে বইছে আনন্দের বন্যা। ইতোমধ্যেই জেলার সচেতন মহল লাঠিটিলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক স্থাপনে সরকার পদক্ষেপ নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। জুড়ীর আপামর জনসাধারণ ছাড়াও লাঠিটিল্লায় সাফারী পার্ক স্থাপনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিরা। সকলেরই দাবি অতি শীঘ্রই যেন সাফারি পার্ক স্থাপনের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়।

জুড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এমএ মোঈদ ফারুক বলেন, সাফারি পার্ককে অনেকে চিড়িয়াখানা মনে করে। কিন্তু এটা মোটেও তা নয়। এখানে বন্যপ্রাণী থাকবে। বন্যপ্রাণীরা তো বনেই থাকে। বন-জঙ্গল সুন্দর করে সংরক্ষণ করা হবে। যেখানে বন্যপ্রাণী থাকবে সেখানে বনের প্রয়োজন আছে। এটি বাংলাদেশের তৃতীয় সাফারি পার্ক। আমরা খুবই আনন্দিত যে আমাদের এলাকায় এত সুন্দর একটি প্রজেক্ট আসছে। লাঠিটিলা পাথারিয়া পাহাড়ের একটি অংশ। যা লাঠিটিলা থেকে আরম্ভ হয়ে শাহবাজপুর পর্যন্ত গিয়েছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের মন্ত্রী মহোদয় কে জুড়ীবাসীর পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। উনাদের প্রতি আমরা সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব। এই পার্কের কার্যক্রম যেন অনতিবিলম্বে শুরু হয়।

জুড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বদরুল হোসেন বলেন, এই এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য আমাদেরকে অভিভূত করে। কিন্তু আজ দিনের পর দিন নৈসর্গিক সৌন্দর্য অম্লাণ হয়ে যাচ্ছে। সেই নৈসর্গিক সৌন্দর্য কে রক্ষার জন্য এবং জনমানুষের হিতকর কাজের জন্য, উন্নতি লাভের জন্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভের জন্য একটি সাফারি পার্ক লাঠিটিলায় হওয়া অতীব প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এটা জুড়ীবাসীর প্রাণের দাবি। এ দাবি পূরণ হওয়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন। লাঠিটিলায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক হলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক উন্নয়ন সাধিত হবে।

জুড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও ফুলতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ বলেন, জুড়ীতে আন্তর্জাতিক মানের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক হতে যাচ্ছে। আমি মনে করি এটি বিশ্বের মধ্যে একটি উন্নত মানের সাফারি পার্ক হবে। সুন্দর একটি পরিবেশ হবে। এখানে বাংলাদেশ এবং বিদেশ থেকেও দর্শনার্থীরা আসবে। এখানকার রাস্তাঘাট অনেক ভালো। পরিবেশও ভালো। আমাদের মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন সাহেব যে উদ্যোগ নিয়েছেন যে জায়গা পছন্দ করেছেন আমি মনে করি তিনি সঠিকভাবে করেছেন। বন ও পরিবেশমন্ত্রী যে জায়গা সাফারি পার্কের জন্য পছন্দ করেছেন এত সুন্দর জায়গা বাংলাদেশের অন্য কোথাও আছে কিনা আমার সন্দেহ হয়। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর নিকট আবেদন জানাই লাঠিটিলাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক যেটা হচ্ছে তার কার্যক্রম যেন অতিসত্বর শুরু হয়।

জুড়ী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রিংকু রঞ্জন দাস বলেন, জুড়ী উপজেলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের সম্ভাব্যতা অনুমোদন হয়েছে। লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক হলে জুড়ী উপজেলা একটি নান্দনিক উপজেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। জুড়ীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। সাফারি পার্ক হলে লাঠিটিলায় যে বনায়ন রয়েছে সে বনায়ন আরও সংরক্ষিত হবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের যে জায়গায় সাফারি পার্ক হয়েছে, সেই এলাকার উন্নয়ন হয়েছে এবং সৌন্দর্য বর্ধিত হয়েছে। এজন্য জুড়ীবাসীর এই দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি সাফারি পার্কের দৃশ্যমান কার্যক্রম যেন অতি শীঘ্রই শুরু হয়।

অন্যান্য খবর পড়ুন